আমার ঘন যামিনীর মাঝে(৩)

ঘরের কোণ

---

ঘরের এই কোণটুকু আমার। কোণঠাসা হ'য়ে। এখানে আফ্রিকান ভায়োলেট ফুটে আছে। মোমবাতি থেকে লাইলাকের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ছোট জলপ্রপাত থেকে ধাপে ধাপে জল। কুকুরছানা পপি মুখে ক'রে ওর খেলনা সজারু নিয়ে ছুটে আসছে।  নীল রঙ ক'রা সিরামিকের কৌটো - আমার মেয়ে ছেলেবেলায় বানিয়েছিল। নীল আমার প্রিয় রঙ, আমার মেয়েরও। তাতে ও এঁকেছে ফুল, মেঘ। রেখেছি একটা নীল রঙের লম্বা ফুলদানি - আমি সেখানে জ্বলে যাওয়া দিশলাই-এর কাঠি গুঁজে রাখি। পড়ে আছে পা-ভাঙা সোপস্টোনের সরস্বতী। ছেলেবেলায় আমার সরস্বতী হওয়ার ইচ্ছে ছিল। তাই নাস্তিক হ'য়েও সরস্বতী বুকে ক'রে ঘুরে বেড়াই। 

ভূগোল বইতে পড়েছিলাম বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল, তখন তার মানচিত্রে আয়তন ছিল ৫৫ হাজার বর্গমাইল। এই খুব ছোট দেশের উপর দিয়ে অনেক ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। তবু আমার এই দেশটি  বঙ্গোপসাগরে  তলিয়ে যায় নি। 

আমার ঘরের এই কোণটুকু বাদ দিয়ে বাড়ির বাকি ৫৫ হাজার বর্গমাইলে বড় বড় পাইন গাছ ভেঙ্গে পড়ছে। পাইন গাছের মাথা ভর্তি বরফের মুকুট থাকলেও সত্তর ফুট লম্বা গাছ যখন মাটিতে ভেঙে পড়ে, তখন তাতে আগুন ধরে যায়। চকমকি পাথরের মনমুগ্ধ ক'রা আগুন নয়, এ দাবানল। বনের হরিণ মারা যায়। 

আমি শুধু ভাবছি কীভাবে আমার পপিকে বাঁচাব। ওকে আমার ঘরের  এই ছোট কোণটায় এনে রাখছি। ছোট্ট কুকুরছানা। ও তো দুই ফুট জায়গায় শান্ত হ'য়ে থাকতে পারে না। লাফ দিয়ে ও বনের হরিণ হ'য়ে যায়।



আজ অন্ধকার ছিল

---

আজ সূর্য ওঠেনি। দিনেরবেলাতেও সন্ধ্যার মত অন্ধকার ছিল। কিন্তু রাত হ'লে দেখি একটা কমলা রঙের চাঁদ উঠেছে। যখন কমলা রঙের চাঁদ ওঠে, আমার বুকের ভিতরটা হুঁহুঁ ক'রে ওঠে। মনে হয় যেন মহাসমুদ্রের উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। মনে হয় হয়ত আমি জীবনের চলার পথে অনেক গল্প ফেলে এসেছি। মনে হয় ঝাউপাতার শব্দই মানুষের জীবনের একমাত্র না বলা কথা। 

আমার খুব সবকিছু ভালোবেসে ফেলতে ইচ্ছে করে। তাই আজ বহু বছর আমি চাঁদের দিকে তাকাই না। কমলা রঙ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। 



পপি

---

আমাদের পপি সকালে ঘুম ভেঙে উঠে খানিকটা ভেলভেট চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। একটা ছোট রুপার কৌটায় ওর দাঁতই রেখেছিলাম। কৌটা চুরি করে ভেলভেটটুকু ছিঁড়েছে। 

গত সপ্তাহে খেলনা ফক্সের পা আর তার ভিতর থাকা বাঁশি খেয়েছিল বলে ভেটের অফিস কী দৌড়াদৌড়ি।  ৪ ঘন্টা হসপিটালে ছিল। 

এবার ছোট টুকরো বলে এখন অপেক্ষা করছি। পপির কোন  যে survival instinct নেই এ এক বিস্ময়।  মনে হয় আমার সাথে থেকে থেকে পৃথিবীশুদ্ধ সব মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখেছে। আরে মানুষের চামড়ার নিচেই যে ছুরি লুকানো থাকে, তা কিভাবে শেখাই?

আমার সূর্য

---

আমার এই উইস্কনসিনে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ঠান্ডা পড়ে যায়। শীত থাকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত। মনে হয় সুন্দরী রিভার বার্চের রূপে মুগ্ধ হয়ে আমি তবু এই হিম নগরী ছেড়ে চলে যেতে পারি নি। তেইশ বছর হয়ে গেল। অথচ এক সূর্যমুখী দেশের মেয়ে আমি। মাঝে মাঝে ভাবি রক্তবিন্দুর বদলে বুঝি সূর্যের কণা ঝিলমিল করে আমার শরীরের ভিতরে। 

মানুষ কীসের টানে কোথায় থেকে যায়, কেউ বলতে পারে না। হয়ত পথে চলতে গিয়ে সে বুনো ফুলের মাঝে একটা পাথর দেখেছিল। মসৃণ নুড়ি পাথর। হয়ত কেউ কেউ সে পাথর নিজ পকেটে পুরে নিজের পছন্দের পথে হেঁটে চলে গেছে। কিন্তু কিছু মানুষ ওই পাথরের পাশে বসে অপেক্ষা করছে। বসন্তে টিউলিপের, গ্রীষ্মে রবিন পাখির নীল ডিমের, হেমন্তে কমলা রঙের ঝরা পাতার, শীতে তুষার-ঝড়ের। 

আমার আজকের আকাশে সূর্য নেই। বাইরে আমি পিতলের সূর্য ঝুলিয়েছি। কোন ফুল ফুটে নেই আমার বাগানে। কিছু সাদা গোলাপ শুকিয়ে সদর দরজায় তাদের আমি রিবন দিয়ে বেঁধে দিয়েছি। বরফ পড়বার শব্দ ছাড়া প্রকৃতিতে আর কোন শব্দ নেই। মেটালিক উইন্ডচাইমের শব্দে তুমি কি তবু আমার কাছে আসবে না

আকাশের চোখ থেকে

---

সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল। হিজলগাছ ভিজে একটি মেয়ের মত একা দাঁড়িয়েছিল। পায়ের কাছে থইথই জল। কদমফুলের গন্ধে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে চমকে একজন আর একজনের চোখের দিকে পলক না ফেলে তাকিয়েছিল। 

আর একদিন বরফ ঝরেছিল। ছোটপাখি ঝাউগাছের পাতায় তার ঠান্ডা পালক গুঁজে রাখতে গিয়েছিল। বুনো খরগোস ঝোপের নিচে নিজেকে লুকিয়ে ভেবেছিল আকাশ আর তাকে আক্রমণ করতে পারবে না। 

এবার তাহলে বৃষ্টি ঝরুক। কিংবা বরফ। আকাশের মন ভালো হয়ে গেলে আমিও বেঁচে উঠব - অজানা কোন এক অমৃত প্রেমে। 

 

'কোন রাতের পাখি গায় একাকী  সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে'

---

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি আকাশের সব আলো নিভে গেছে। আশেপাশে কোন ঝরণা নেই। তবু ঝরণার জলের মত নৈ:শব্দ ঝরছে। সেই কালোর ভিতর উচ্চস্বরে গান গাচ্ছে সিকাডা পোকা। মাটির নিচে সতেরো বছর ছিল ওরা। মাটির নিচে বেঁচে ছিল। এখন মাটি ফুঁড়ে পৃথিবীতে মরতে এসেছে সন্তানের জন্ম দিয়ে। আমারও মনে হল মানুষের জীবনের সার্থকতাও সন্তানের জন্ম দিতে দিতে মরে গিয়ে।

 

নিজের জন্য বাঁচে না মানুষ, বাঁচে পরের প্রজন্মের জন্য। সিকাডা পোকার মত গান গেয়ে। 'একাকী, সংগীবিহীন অন্ধকারে।'

স্বপ্নের খোলস

---

স্বপ্ন শেষ হ'য়ে গেলে কী থাকে মানুষের? স্বপ্নের খোলস? সে কী অজগরের ফেলে আসা চামড়ার মত

মানুষ কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় যেতে চায়। সমুদ্রের গভীর নীলে। বেলুগা হোয়েলের সাথে গান গায় সে। মহাশূন্যে পাক খায়। অসীম শক্তিধর মানুষই পারে স্বপ্নের ওপাড়ে স্বপ্ন গড়তে। 

সেই মানুষের স্বপ্ন যখন ভেঙে যায়, কী করে সে? মেরুদন্ড ভেঙে গিয়ে সাপের মত মাটিতে পিচ্ছিল হাঁটে? সাপের চোখে কী জল আছে? বুকে দীর্ঘশ্বাস?

Comments