আমার ঘন যামিনীর মাঝে(২)


ড্যাফোডিল

প্রেমের মৃত্যু মানুষের মৃত্যু থেকে ভয়ানক। মানুষের মৃত্যু হ'লে মৃত্যুবার্ষিকী থাকে। মৃত মানুষের কবরে ফুল দেওয়া থাকে। প্রেমের মৃত্যু হ'লে জীবন্ত মানুষের দিকেও ফিরে তাকানো থাকে না। 

তবু মানুষ অদ্ভুত প্রাণী। যে বাড়ি ছেড়ে তাকে চলে যেতে হ'বে, যে বারান্দা ছেড়ে - তার আঙিনায় সে কোন এক হেমন্তে হাজার ড্যাফোডিল লাগিয়ে ফেলে। ওই ড্যাফোডিলের ফুটে ওঠা সে কোনদিন দেখতে পাবে না বরফ শেষ হওয়ার পর।  

ড্যাফোডিলও অদ্ভুত ফুল। বিষাক্ত। কিন্তু প্রতি বছর ওরা ছড়িয়ে পড়ে। আগের বছরের থেকে বেশি ক'রে।  এক সময় পুরো মাঠ ছেয়ে ফেলে। যে এই ড্যাফোডিল লাগিয়েছিল তার জন্য না হলেও অন্য পথচারীদের জন্য। রাস্তা দিয়ে যারা হেঁটে যাবে তাদের চোখ ঝলসে দিয়ে অনেক বরফের পরে। 



ধূলিঝড়

ঘরের ভিতর ধূলিঝড় ছাড়াও ধুলো জমতে থাকে - অব্যবহারে, অপব্যবহারে। পিয়ানোর সাদা-কালো কী-বোর্ডের উপর। বই-এর মলাটের উপর। বুক শেলফের উপর। টেবিলের উপর। দেওয়ালে টাঙানো, ভুলে যাওয়া, বহু আগেকার পুরনো ছবির উপর। আঙুলের ডগার উপর -স্থবির জীবনের উপর। ঘরের ভিতর তো আর বৃষ্টি হয় না। তাই সেই ধুলো ফেলে দেওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া টুকরো কাপড় দিয়ে প্রতিদিন মুছতে হয়। তবু পরের দিনই ঠিক আগের সেই সাদা কালো জীবনের উপর আবার ধুলো জমে যায়। 

অথচ যদি ঘরের জানালা খুলে দিই, আরো কিছু ধুলো বাইরে থেকে ঘরে আসলেও, কিছু ধুলো বাতাসে বাইরে উড়েও যাবে। সময়ের ফাঁকে একসময় তারা মাটি হ'য়ে যাবে। সে মাটিতে বৃষ্টি ঝরে পড়বে। সূর্য  আলো দেবে। বাইরের পৃথিবীর বাতাস ঝিঁ ঝিঁ পোকার গান শোনাবে। 

মাটি হ'য়ে যাওয়া সে ধুলোয় টি-রোজ ফুটবে। টি-রোজ ঘরের ভিতর ফোটে না। বাইরের পৃথিবীর গোলাপ কেটে আমরা তাকে শুধু ঘরে জলে রাখতে পারি।

পিয়ানো

ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িতে গানের স্কুল বসত। আমি গান করতে পারি না। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবদের সাথে হারমোনিয়ামের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতাম। বাড়িতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ওস্তাদ হরিপদ দাদু আসতেন। আমি পুরো ছেলেবেলা তানপুরার পাশেও গন্ধ শুঁকে শুঁকে কাটিয়েছি। আমার কুকুর পপি যেমন। ও চায়কোভস্কি বাজাতে পারে না। পিয়ানোর নিচে গিয়ে একটু আগে যে ওই পিয়ানো বাজিয়ে চলে গেছেতার ফেলে যাওয়া গন্ধ শোঁকে।

আমার কাছেও ফেলে যাওয়া গন্ধ সবসময়ই জলজ্যান্তপুরো মানুষের চেয়ে দামি। আজ গান থেমে গেছে। এই পিয়ানো দু'ভাগ করে তার কাঠ সের দরে বেচে দেওয়া হবে। হাটের মাঝে সেই চ্যালাকাঠ ডাঁই ক'রে রাখা হয়েছে - আলুপিঁয়াজের পাশেই।

ঘরের দরজার গোল-মসৃণতেল-চকচকে নববহু একলা দুপুরে তাকিয়ে দেখা জানালার বাইরের আকাশযে কোন সময়েই শূন্যে ঝুলে  পড়বার কড়িকাঠ - আমি সবই দেখতে পাচ্ছি। স্খলিত মানুষকে ভালোবাসতে পারিনি ব'লে আমি ওদের ভালোবেসেছিলাম। ওদের রক্ত-ঝরাটুকু ওরা আমার শূন্য পিগি ব্যাঙ্কে যত্ন ক'রে রেখে দিচ্ছে।

এ পিয়ানোতে আর কেউ কোনদিন 'আভে মারিয়াবাজাবে না।

পদ্মপাতার জল

সেই ছেলেবেলা থেকে পদ্মপাতার জল দেখছি। বিস্ময়ে। যে পাতার উপরে আছে, সে পাতা ও ভিজিয়ে দেয় না। ভেঙেচুড়ে যায় হয়ত। কিন্তু সেও ছোট ছোট জলের বিন্দুতে। একসময় রোদ পোহানো শেষ হ'লে; আকাশ, চারপাশের গাছ এবং ফুলের ছবি নিজের শরীরে আঁকা শেষ হ'লে - ও হঠা 'রে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মত। জীবনের মত। 'জীবন পদ্মপাতার জল।'

এইসব কথা নিয়ে আমি খুব গভীরভাবে ভাবতে চাই না। আমি শুধু মনে রাখতে চাই পদ্মপাতার জলে প্রতিবিম্বিত হওয়া আকাশ, গাছ আর ফুলের কথা। মনে রাখতে চাই ভোরের ছটফটে আলো আর জলফড়িংটাকে। 

Comments