আমার ঘন যামিনীর মাঝে (১)
আকাশ থাকে রাতের আঁধারে। সেদিন আমি ভেবেছিলাম কোনদিন খুব অন্ধকারেও যদি ডুবে যাই, আমি ঠিক আলো খুঁজে পাব। মানুষের ভাবনাগুলো মানুষের হৃৎপিণ্ডের থেকে আস্তে নিঃশ্বাস নেয়। তাই আলো আমি খুঁজে পাইনি।
কিন্তু নিঃশ্বাস নেওয়ার
বাইরেও মানুষের হাতের মুঠোয় একটা ম্যাজিক থাকে। যাদুকরের হাতের ভিতর থেকে যেমন লাল, নীল সিল্কের রুমাল কিংবা সাদা, সাদা কবুতর ডানা ছটফটিয়ে যাদুর
স্টেজের এ মাথা থেকে ও মাথা হাসি আর আনন্দে ভরে দেয়, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনের একমাত্র
ম্যাজিক হল - মানুষ আঁধারেও বাঁচে।
যে জীবন কাঁচের নিচে
---
কাল বরফ পড়েছিল। বছরের প্রথম বরফ। প্রথম প্রেমের মত।
আজ বিকালে বাগানে গিয়ে দেখি সে বরফ যেন কাঁচ হয়ে গেছে। আর তার নিচ থেকে সবুজ রঙের সুইট উডরাফ উঁকি দিচ্ছে। গরমকালে সুইট উডরাফ দিয়ে মে ওয়াইন বানায় এ দেশের মানুষ। নেশা থাকে মদে এবং জীবনে।
আমি অবাক হ'য়ে দেখলাম মানুষের শেষ গল্পটুকু। বরফের নিচ
থেকে, কাঁচের নিচ থেকে সে উঁকি দিচ্ছে। সে মরে যায়
নি। সে জীবন্ত। ঝরে যাওয়া হলুদ পাতার পাশে।
অর্কিডের মত পেখম মেলে
---
আমার সকাল হ'য় খুব আগে। রাত তিনটায় পাখিদের সাথেই বুঝি উঠে পড়ি আমি। 'কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে...আমি কান
পেতে রই।'
আসলে সংসারে কাজের তো শেষ নেই। আমার সংসার আবার জগৎ-সংসার নিয়ে। ফুল নিয়ে, পাখি নিয়ে, আকাশের তারা নিয়ে, জীবনের সব অন্ধকার উপচে ফেলা সোনালি সূর্য নিয়ে। কুকুর নিয়ে, বিড়াল নিয়ে, উত্তর মেরুর পোলার বিয়ার, দক্ষিণ মেরুর পেঙ্গুইন, আর অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালা নিয়ে। যেসব বেদনা বেদনার ওপারে, সেই বেদনা নিয়ে।
ফলে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ঘুরে রাত গভীর হ'য়ে গেলেও কাজ আর আমার শেষ হ'য় না।
আজ দেখি এই
অর্কিডটা ফুটেছে। বছরে একবার ফোটে এই ফুল। একবার ফোটে ব'লে অর্কিড মায়ের কী অনেক প্রত্যাশা থাকে ওর কাছে? প্রায় মাস তিনেক ফুটে থাকে অর্কিড একবার ফুটলে। মানুষ মা নয় মাস
তার সন্তানকে বয়ে বেড়ায় বলে জীবনে তার সন্তানের ব্যর্থতা কিংবা সাফল্য তার প্রাণে
কতটুকু বাজে? বই-এর পৃষ্ঠা উল্টে দেখি হাতি মা তার
সন্তানকে পেটে বয়ে নিয়ে বেড়ায় বাইশ মাস, স্তন্যপায়ী
প্রাণীদের মাঝে সবচেয়ে দীর্ঘ এ সময়।
মানুষ
অর্কিডের মতই ফুটে উঠুক। অক্লেশে।
অপেক্ষা
---
বাংলাদেশের
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বাবাকে মেরে ফেলে। তখন আমার বয়স সাড়ে চার। আমি দিনের
পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বাবার জন্য অপেক্ষা করে থেকেছি। তবে
মুখ ফুটে সে কথাটা কাউকে বলতে পারি নি। যেসব মানুষের বয়স চারপাশের বড় মানুষদের মত
হয় না, তারা বুকের ভিতর কথা লুকিয়ে
রাখতে পারে।
বালিকাবেলায়
আমি বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেছি। বৃষ্টিতে সবুজ আর গোলাপি রঙের চুলের মত কড়ই আর
শিরীষফুল কীভাবে ভিজে যায় তা দেখবার জন্য।
যখন আমার
তরুণী বয়স, আমি আমার প্রেমিকের জন্য
ট্রেন স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেছি। কিছু ট্রেন এসেছে, কিছু ট্রেন আসে নি।
মধ্যবয়সে
অপেক্ষা করেছি অতিথির জন্য। জানালা দিয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখেছি
কিভাবে জাফরানের রঙ দুধের ভিতর গলে গলে যায়।
জীবনের
শেষপ্রান্তে এসে আমি আজকাল আর কারো জন্য, কিংবা কোনকিছুর জন্য অপেক্ষা করিনা। অপেক্ষা করিনা কোজাগরী পূর্ণিমার
জন্য। শিউলিফুলের জন্য। নতুন কনের চোখ জলে ভিজিয়ে দেওয়া বিসমিল্লাহ খানের শানাই
কিংবা দূর্গাপূজার ঢাকের শব্দের জন্য।
আমি
কোথাও গেলে আমার কুকুর শুধু আজও সারাদিন দরজার সামনে অপেক্ষা ক'রে বসে থাকে। ও এখনো মানুষ হয় নি!
গাছ
---
মাথাভর্তি
বেগুনি রঙের মেঘের মত ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জাকারান্ডা গাছের দিকে ছেলেবেলায় আমি
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। বেগুনি আর নীল রঙ আমার খুব প্রিয়। সবসময়ই বিমর্ষ
সবকিছু আমার প্রিয়।
যুক্তির
নৌকায় ভেসে যদি চলি তবে আমি জানি,
বরফে
ছাওয়া উইস্কনসিনে জাকারান্ডা কোনদিন ফুটবে না। তবু বছর দুই আগে যখন ফ্লোরিডা থেকে
মেলে ক'রে আমার জন্য জাকারান্ডার
চারা এল, আমার মনে হ'ল বুঝি দেবশিশুর দিকে তাকিয়ে আছি। কী অসংখ্য, ছোট ছোট সবুজ পাতা গাছটায়!
গরমকালে
যখন সূর্যের তাপ বাড়ে, গাছটাকে বাইরে নিয়ে যাই। আর
শীতকালে যখন চারদিক বরফে সাদা হয়ে যায়, টবের ভিতর বেড়ে ওঠা আমার জাকারান্ডা গাছকে ঘরে নিয়ে আসি। নয়মাস ঘরের
ফুল-স্পেকট্রাম আলোর নিচে রাখি।
তবু আমার
দৃঢ় বিশ্বাস কোন একদিন এই উইস্কনসিনেই বেগুনি রঙের জাকারান্ডা ফুটবে। ফুটতে তো
পারেই। পারে না?
গাছে জল
দিলে ভালোবাসাটুকু গলে গলে গাছের পায়ে পড়ে। ভিজে পায়ের ছাপ গাছ কোনদিন ভোলে না।


Comments
Post a Comment