-কল্যাণী রমা
ধর্ম
---
ধর্ম নিয়ে আমরা মহাভারত লিখতে পারি।
কোরান শরীফ লিখতে পারি। বাইবেল লিখতে পারি। কিন্তু আজ শুধু দু'টো কথা বলতে চাই। অনেক কথা নয়।
আমি ঈশ্বরবিশ্বাসী নই। তার মানেই কি আমার হাতে আমি দা, বটি, চাপাতি তুলে নেব? ধর্মবিশ্বাসী হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিমদের কেটে টুকরো টুকরো করে মাছভাজা করে খাব?
দেশ থেকে খবর পাই মুসলিমদের ভয়ে বাংলাদেশের গ্রামে হিন্দুরা হাওরে গিয়ে লুকিয়ে ছিল - জীবন বাঁচাতে। হিন্দুঘর থেকে মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মন্দির ভেঙে ফেলা হচ্ছে। হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে আগুন। 'ইনকিলাবে' ফলাও করে ছাপা হয়েছে একজন হিন্দুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের কাহিনী। সেদিন দেখি আর একজন আমাকে পাঠিয়েছে 'কাবা শরীফের' স্থাপত্যকলা! কেন?
আসলে আমাদের জীবনের ইতিহাসে 'লজ্জা' শব্দটির সৃষ্টি হয়নি। 'সহমর্মিতা', 'সহবস্থান'- এই শব্দগুলোর কিছুই আমরা জানি না।
তবে আমি এও জানি, যখনই এ কথাগুলো নিয়ে দু'টো কথা বলতে শুরু করব, তখনই সাথে সাথে পাশের দেশ ভারতের সাথে তুলনা শুরু হয়ে যাবে। বাংলাদেশের মুসলিমদের কাছ থেকে, এবং ভারতের হিন্দুদের কাছ থেকে। এ কথা ধ্রুব সত্য যে সব যুদ্ধেই, প্রতিটি দেশের মানুষেরই রক্তের রঙ লাল।
তবে এ মুহূর্তে কোন তুলনামূলক সাহিত্য আলোচনায় যেতে চাই না, আমি আমার দেশের কথা বলতে চাই, শ্বশুরবাড়ি ভারতের নয়। বহু সময়ই তুলনায়, আসল গল্প ভেসে যায়।
ঐশী বাণী আকাশ থেকে নামতে পারে। শুধু ভালোবাসা কেন বৃষ্টির ধারায় নামে না?
বাবার গল্প
---
বাবার গল্প মানে যার শুরু বা শেষ কোনটাই খুব স্পষ্ট নয়। সবই কেমন কুয়াশায় ঢাকা। নিজের গল্প নয়, নিজের কথা নয় - এতটাই ছোট ছিলাম আমি। সবই আসলে ছিন্ন, ছিন্ন অন্যদের মুখে শোনা কথা। ভালোবাসায় মোড়ানো কথা। যারা যারা বাবাকে কাছ থেকে চিনত তাদের কথা।
আমার বাবাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মেরে ফেলে। বাবা চলে গেছে। কিন্তু বাবার হাতের লেখাটুকু আছে। সে লেখাই আমার স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তি!
বাবা-মা'র বিয়েতে মতিন কাকু রবীন্দ্র রচনাবলী দিয়েছিলেন। মতিনকাকু সিলেটের, বাবার ছেলেবেলার বন্ধু। হ্যাঁ, তখনও মানুষ বিয়েতে বই উপহার দিত।
আমাদের সেই রবীন্দ্র রচনাবলীর সূচীপত্র ছিল না। বাবা প্রতিদিন দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর হাতে লিখে তার সূচীপত্র করত। আমি এমন বাংলা হাতের লেখা আর কোনদিন কোথাও দেখি নি।
১৯৬৬ সালের সেই রবীন্দ্র রচনাবলী পোকায় কেটে এখন ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। মা একজনকে খুঁজে পেয়েছে। তিনি আবার তা বাঁধিয়ে দিচ্ছেন।
এ দেশে যেভাবে রাখে সেভাবে বাবার ছাই কোন আর্নে করে আমার কাছে নেই। আমার দেশের বাড়ি, সিলেটের গ্রামের বাড়ির মাটি আমার কাছে নেই। রক্তে ভেজা কিছুই নেই। শুধু বুকের খুব ভিতরে রক্তের দাগটুকু আছে।
মা'কে বলেছি বাবার হাতে লেখা রবীন্দ্র রচনাবলীর সূচীপত্রটুকু আমায় দিতে।
ধর্মনিরপেক্ষতা
---
আজ সারাদিন খুব অস্থিরতার ভিতর কেটেছে।
ঘুরেফিরে শুধু শুনেছি-
'এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে
রক্তিম সূর্য
আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ
কোনদিন শোধ হবে না।'
২৬শে মার্চ আমার সোনার দেশ বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর হলো। কল্পনা করা যায়? বাবা ছাড়া সেই কোন ছেলেবেলা থেকে একটা একটা করে দিন কেটেছে। সেইসব দিন মাস পেরিয়ে, বছর পেরিয়ে আজ পঞ্চাশ বছরে এসে ঠেকেছে। এ যেন সাদা কবুতর নীল আকাশে ছাড়া পেল। কিন্তু সত্যিই কী তাই?
আমি ভাবছিলাম এমন অনেক সময় হয় না? জন্ম দিতে গিয়ে মা'র মৃত্যু হ'ল। সারা জীবনই সেই শিশুটিকে যখনই জিজ্ঞাসা করা যাবে, 'তোমার মা কবে মারা গেলেন?' 'এই আমার যত বছর বয়স, আমার মা'র মৃত্যুও তত বছর!' আমার কাছে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসও তেমন। আমার কত কত বন্ধুর বাবা, মা, ভাই, বোন '৭১ এর যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে! সেইসব মৃত্যুর বয়স আজ ৫০ বছর হল - বাংলাদেশের জন্মের বয়সের সমান। একটি শিশুর জন্ম হ'তে সময় লাগে নয় মাস। নয় মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশেরও জন্ম।
চারদিক থেকে আজকাল বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতির কথা শুনতে পাই। সবই অসাধারণ খবর। কিন্তু চাল, ডালের হিসাবের সাথে, সাথে আমি বাংলাদেশের মানচিত্রের সাথে জড়িয়ে শুধু আর একটি মূলকথা শুনতে চাই - আর সেটি হ'ল 'ধর্মনিরপেক্ষতা।'
২৬শে মার্চ, ২০২১
কপালের
লাল টিপ বনাম হিজাব, বোরখা
আমার কপালের টিপ আমার,
আমার চোখের কাজল আমার,
আমার কালো চুলে,
বেলিফুলের মালা আমার,
লাল পাড়, ঘিয়ে গরদের শাড়ি আমার -
আমার শরীরের রক্ত যেমন আমার।
তোমরা এর কিছুই
কেড়ে নিতে পারবে না
মুছে দিতে পারবে না।
আমি বাঙালি।
আমার পরিচয়
চাঁদের হাসির সাথেই
উছলে পড়বে।
আমেরিকায় একটি কথা খুব শুনি। Politically
correct হওয়া। শুনি বিশেষভাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে। কিন্তু,
আপাতদৃষ্টিতে এক মনে হলেও একটি মেয়ের কপালে টিপ পরবার আর হিজাব, বোরখা পরবার
স্বাধীনতা এক কথা নয়। এটা যার যা পোশাক পরতে ইচ্ছে করছে তাকে তা পরতে দেওয়াও নয়।
আজকের বাংলাদেশে এই চারদিকে হিজাব ছড়িয়ে পরাটা
ইসলামি আগ্রাসন। বাঙালি মেয়ের চিরদিনের পোশাক শাড়ি, টিপ, খোঁপায় বেলিফুলের মালা
ঢেকে দেওয়ার এক চক্রান্ত। এটা political correctness নয়। কই, আমাদের ছেলেবেলায় তো
এমন দেখি নি। এটা ভারতে বিজেপির গেরুয়া রঙ ছড়িয়ে পরবার মতই। এইসব আসলে ধর্মের নামে
সমাজে বিষ ছড়িয়ে দেওয়া।
নেটিভ আমেরিকানরা পায়ে, হাতে সেলাই করা মোকাসিন
জুতা পরে। একইভাবে বাঙালি মেয়েদের পোশাকের অংশ তার কপালের টিপ। এ থেকে বঞ্চিত করা
মানে তাদের সংস্কৃতিকে গলা টিপে হত্যা করা।
সে অনেকদিন আগে, ছেলেবেলায় মরুভূমির মাঝে আমি
কিছু বেদুইন মেয়ে দেখেছিলাম। আজো মনে পড়ে একটি মেয়ের গায়ে ছিল নীল রঙের সারা শরীর
ঢাকা পোশাক। কিন্তু তার কালো নেকাবের ফাঁক দিয়ে আমি দেখতে পেয়েছিলাম হাস্যোজ্বল,
বুদ্ধিদীপ্ত দু'টো টানা টানা চোখ। অপূর্ব, স্বাভাবিক সেই মেয়েটিকেই আমার মরুদ্যান
বলে মনে হয়েছিল।
মাঝে মাঝে দেখি বাংলাদেশে ছেলেরা সালোয়ার পরে
ঘুরে বেড়াচ্ছে। অস্বীকার করব না মনটা দমে যায়। মনে পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে
বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানের বর্বরতার কথা। আমি রক্তের বেদনার ইতিহাস ভুলতে পারি
না। সালোয়ার পাকিস্তানের ছেলেদের দৈনন্দিন জীবনের পোশাক।
এখন পোশাকের সাথে ধর্ম আগ্রাসী হ'য়ে এগিয়ে আসছে।
পোশাকের সাথে আমাদের নিজ দেশের সংস্কৃতির মৃত্যু হচ্ছে। আসলে একটি জাতির কোন পোশাক
সহজাত আর কোন পোশাক চাপিয়ে দেওয়া, তাতো আমাদের বুঝতে শিখতে হবে।
4/4/2022
Comments
Post a Comment